রামগতিতে ছাত্রদল নেতাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ, অস্বীকার অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরের।

কবির হোসেন রাকিব, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:

ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা চললেও লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলায় মেঘনা নদীতে মা ইলিশ শিকার বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের ঢিলেঢালা অভিযানের সুযোগে উপজেলার বিভিন্ন মাছঘাটে সক্রিয় রয়েছে একাধিক সিন্ডিকেট। এসব চক্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারে সহায়তা এবং কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক এক নেতাসহ কয়েকজনের নাম সামনে এসেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ওই সাবেক ছাত্রদল নেতা।

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চলছে মাছ শিকার

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মা ইলিশ সংরক্ষণে মেঘনা নদীর নির্ধারিত অভয়াশ্রমসহ দেশের সংশ্লিষ্ট নদ-নদীতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ, পরিবহন ও বিপণন নিষিদ্ধ রয়েছে।

তবে এ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রামগতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাছ শিকার ও বেচাকেনা চলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার কয়েকটি মাছঘাট সরেজমিনে পরিদর্শন করে এমন চিত্র দেখা গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার বিবিরহাট, ওছখালী, ব্রিজঘাট, আসলপাড়া, টাঙ্কিরঘাট, আলেকজান্ডার, বালুরচর ও বাংলাবাজার এলাকার মেঘনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকার চলছে।

রাতভর নৌকা নিয়ে নদীতে নামছেন জেলেরা

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর রামগতি বাজার মাছঘাটসংলগ্ন মান্তাপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাছ কেনার জন্য বহু ব্যবসায়ী অপেক্ষা করছেন। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে কয়েকজন ব্যবসায়ী মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত সরে যান।

স্থানীয় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেলে ৮ থেকে ১০টি নৌকা মাছ শিকারে নদীতে যায়। সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে এসব নৌকা মাছ নিয়ে ঘাটে ফেরে। এ সময় ক্রেতা ও পাইকাররা মাছ কেনার জন্য অপেক্ষা করেন। এ ছাড়া রাতভর আরও ১২ থেকে ১৫টি নৌকা মাছ শিকার করে ভোরে ঘাটে ফেরে। তখন ঘাটে মানুষের ভিড় আরও বেড়ে যায়।

এসব নৌকা কারা নিয়ন্ত্রণ করেন—এমন প্রশ্নে উপস্থিত তিনজন মাছ ব্যবসায়ী লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম, বিএনপির কর্মী ডলার নোমান ও হালিম মাঝির নাম উল্লেখ করেন। তাঁদের দাবি, এসব নৌকা তাঁদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।

অর্থের বিনিময়ে মাছ শিকারে সহায়তার অভিযোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিকেল থেকে শুরু করে সারা রাত মেঘনায় মাছ শিকার চলে। নদীতে নামা জেলেদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে একটি চক্র মাছ ধরার কাজে সহায়তা করছে। এ চক্রের সঙ্গে জাহাঙ্গীর আলম, ডলার নোমান ও হালিম মাঝি জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন প্রায় ৩০টি ছোট-বড় ও মাঝারি নৌকা মেঘনায় মাছ শিকার করে। মান্তাপাড়া এলাকায় পরিচালিত কথিত এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে চরগাজী ও বড়খেরী ইউনিয়ন ছাত্রদল এবং যুবদলের কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন এলাকার দুই বিএনপি নেতা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই দুই নেতা বলেন, দলের কিছু নেতাকর্মীর বেপরোয়া আচরণের কারণে অনেকে কথা বলতে সাহস পান না। তাঁদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ‘ম্যানেজ’ না করে এ ধরনের কার্যক্রম চালানো কঠিন।

তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।

শতাধিক ব্যবসায়ীর মাছ কেনার অভিযোগ

মাছ কিনতে আসা সিরাজ উদ্দিন ও রফিক মাঝি জানান, নিষেধাজ্ঞার সময়েও তাঁরা নিয়মিত ওই স্থান থেকে মাছ কিনছেন। তাঁদের দাবি, তাঁদের মতো প্রায় দুই শতাধিক ব্যবসায়ী সেখানে মাছ কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত।

তাঁদের ভাষ্য, আর্থিক সংকট ও ঋণের চাপে কিছু জেলে নদীতে মাছ ধরতে বাধ্য হচ্ছেন। একই সঙ্গে তাঁরা অভিযোগ করেন, মাছ শিকার ও কেনাবেচা নির্বিঘ্ন রাখতে জাহাঙ্গীর আলম, ডলার নোমান ও হালিম মাঝি বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। তবে এ দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রশাসনের অভিযানে শিথিলতার অভিযোগ

স্থানীয় ব্যবসায়ী ফজল করিম ও আবির হোসেন অভিযোগ করেন, এ বছর মা ইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসনের তৎপরতা আগের বছরগুলোর তুলনায় কম। তাঁদের মতে, পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় নদীতে নির্বিচারে মাছ শিকারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জনবল সংকটসহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার জাহাঙ্গীর আলমের

অভিযোগের বিষয়ে মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রাজনীতি করার কারণে তাঁর পক্ষে-বিপক্ষে লোকজন রয়েছে। তাঁদের কেউ এমন অভিযোগ করে থাকতে পারেন। তবে তিনি মা ইলিশ শিকার বা সংশ্লিষ্ট কোনো সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেন।

রামগতি উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক শিবলী নোমান বলেন, সরকারের আইন অনুযায়ী ২২ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ। এ সময়ে কেউ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মাছ শিকারের সঙ্গে জড়িত হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। এতে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই। তাঁর ভাষায়, অপরাধীর পরিচয় অপরাধী।

অভিযান জোরদারের আশ্বাস মৎস্য কর্মকর্তার

রামগতির বড়খেরী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ আলী বলেন, জনবল সংকটসহ নানা কারণে বিশাল নদী পাহারা দেওয়া কঠিন। তারপরও নৌ-পুলিশের সদস্যরা সামর্থ্য অনুযায়ী অভিযান চালাচ্ছেন। অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রামগতি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সৌরভ-উজ-জামান বলেন, অভিযুক্তদের বিষয়ে তিনি আগেও বিভিন্ন তথ্য শুনেছেন। গত দুই দিনে তিনি ওই এলাকায় কয়েকবার গেছেন এবং জাহাঙ্গীর আলমকে টেলিফোনে সতর্ক করেছেন। এ ছাড়া কিছু জাল ও নৌকা আটক করা হয়েছে। শুক্রবার থেকে অভিযান আরও কঠোর করা হবে বলেও জানান তিনি।

লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁরাও শুনেছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।

মা ইলিশ সংরক্ষণে কঠোর নজরদারির দাবি

মেঘনা নদীতে মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে নিয়মিত অভিযান, মাছঘাটে নজরদারি এবং অবৈধ মাছ পরিবহন ও বিপণন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তাঁদের মতে, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া গেলে মা ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।

Facebook
WhatsApp
Email
Pinterest
Telegram