কমলনগরে অপচিকিৎসায় নবজাতকের মৃ/ত্যু/র অভিযোগ, আশঙ্কাজনক প্রসূতি; তদন্ত কমিটি গঠন।

কবির হোসেন রাকিব, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি

লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে লাইফ লাইন (প্রা.) হাসপাতালে অপচিকিৎসার অভিযোগে এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই ঘটনায় প্রসূতি শাহনাজ বেগমের (২০) শারীরিক অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাসেবাদাতার বিরুদ্ধে বিচার চেয়ে জেলা সিভিল সার্জনসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন নবজাতকের বাবা মো. আরিফ হোসেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে লক্ষ্মীপুরের জেলা সিভিল সার্জন ডা. বাহারুল আলমের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন আরিফ হোসেন। একই সঙ্গে অভিযোগের অনুলিপি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ও লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসকের কাছেও পাঠানো হয়েছে। আরিফ হোসেন কমলনগর উপজেলার চর লরেন্স ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. আজাদের ছেলে।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ অক্টোবর রাতে প্রসববেদনা শুরু হলে স্ত্রী শাহনাজ বেগমকে কমলনগরের করইতলা বাজার এলাকার লাইফ লাইন হাসপাতালে নিয়ে যান আরিফ হোসেন। সেখানে দায়িত্বে থাকা সুমাইয়া ইসলাম সুমনা আলট্রাসনোগ্রাফি করে স্বাভাবিক প্রসবের আশ্বাস দিয়ে শাহনাজকে হাসপাতালে ভর্তি করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিবারের দাবি, হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টা পার হলেও প্রসবের কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ নিয়ে স্বজনরা উদ্বেগ প্রকাশ করলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সেবাদাতার কাছ থেকে দুর্ব্যবহারের শিকার হন বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় প্রসূতিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুরোধ জানান স্বজনরা। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছাড়পত্র না দিয়ে রোগীকে আটকে রেখে একের পর এক ইনজেকশন প্রয়োগ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে গর্ভেই নবজাতকের মৃত্যু হয় বলে পরিবারের দাবি। পরে দ্রুত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নবজাতককে বের করা হয়। এ সময় যথাযথভাবে অবশ না করেই অস্ত্রোপচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।

চিকিৎসকের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সুমাইয়া ইসলাম সুমনা এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক নন; তিনি ডিএমএফ (মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট) সনদধারী। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অনুমোদন ছাড়া তাঁকে দিয়ে প্রসূতির চিকিৎসা এবং আলট্রাসনোগ্রাফির মতো স্পর্শকাতর সেবা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।

এ ছাড়া হাসপাতালটিতে এমবিবিএস চিকিৎসক ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা এবং এর আগেও নবজাতকের মৃত্যু ও প্রসূতিদের শারীরিক জটিলতার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রসূতির অবস্থা আশঙ্কাজনক, পরিবারের বিচার দাবি

নবজাতকের বাবা আরিফ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, “আমরা বারবার অনুরোধ করার পরও রোগীকে জেলা বা ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য নিতে দেওয়া হয়নি। উল্টো আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে এবং রোগীকে একের পর এক ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “অবশ না করেই তড়িঘড়ি করে অস্ত্রোপচার ও সেলাই করা হয়েছে। এতে আমার স্ত্রীর অবস্থাও আশঙ্কাজনক হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সে লক্ষ্মীপুরের একটি হাসপাতালে গাইনি বিশেষজ্ঞের অধীনে চিকিৎসাধীন রয়েছে। চিকিৎসক জানিয়েছেন, তাকে সঠিকভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি এবং সেলাইও ঠিকমতো করা হয়নি।”

এ ঘটনায় লাইফ লাইন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সুমাইয়া ইসলাম সুমনার বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান আরিফ হোসেন।

অভিযোগ অস্বীকার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের

অভিযোগের বিষয়ে লাইফ লাইন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগের বিষয়টি শুনেছি। তবে কিছু লোক আমাকে সাময়িকভাবে হয়রানি করার মিশন নিয়ে এসব করছে।”

পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

লক্ষ্মীপুরের জেলা সিভিল সার্জন ডা. বাহারুল আলম লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনাটি তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমান জানান, সিভিল সার্জনের নির্দেশনা অনুযায়ী পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কনসালটেন্ট ডা. মনোয়ার হোসেনকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর অভিযোগের সত্যতা ও দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

Facebook
WhatsApp
Email
Pinterest
Telegram