আইজিপি পদে পরিবর্তনের আলোচনা জোরালো, বিবেচনায় ১৫তম বিসিএসের তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা

‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বর্তমান পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের বিতর্কিত মন্তব্যের পর পুলিশপ্রধানের পদে পরিবর্তনের আলোচনা জোরালো হয়েছে। নতুন আইজিপি নিয়োগের বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে। এ পদে ১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের নামও আলোচনায় রয়েছে।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সম্ভাব্য তিন প্রার্থীর ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্যসংবলিত নথি তলব করেছে। তবে নতুন আইজিপি নিয়োগের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

আলোচনায় থাকা তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা

আইজিপি পদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাঁদের নাম আলোচনায় রয়েছে, তাঁরা হলেন—

১. অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ: আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান।

২. অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন: অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান।

৩. অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ: স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মহাপরিচালক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই তিন কর্মকর্তা পদোন্নতি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।

হাসিব আজিজের কর্মজীবন

অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ বর্তমানে এপিবিএন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের এই কর্মকর্তা ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০২৬ সালের মার্চে তাঁকে এপিবিএন প্রধান করা হয়।

এর আগে তিনি সিআইডির ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলের কমান্ড্যান্ট, ইন্টারপোল ডেস্কের প্রধান এবং টাঙ্গাইল পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭১ সালে শরীয়তপুরে জন্মগ্রহণকারী হাসিব আজিজ সাবেক আইজিপি এম আজিজুল হকের সন্তান। এম আজিজুল হক ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

সিআইডি প্রধান ব্যারিস্টার মোশাররফ হোসেন

অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই সিআইডি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের এই কর্মকর্তা ১৯৯৫ সালে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন।

তিনি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং যুক্তরাজ্যে আইনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।

সিআইডি প্রধান হওয়ার আগে তিনি প্রেষণে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই পদে থাকাকালীন তিনি অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পান।

মাঠপর্যায়ে তিনি পিরোজপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) ছিলেন। এ ছাড়া সিআইডি সদর দপ্তর, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা ইউনিটসহ বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, ডিএমপি, সিএমপি, র‍্যাব ও পুলিশ সদর দপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন।

এসআরবি প্রধান আহসান হাবিব পলাশ

অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ নবগঠিত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) প্রথম মহাপরিচালক। এর আগে তিনি র‍্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের এই কর্মকর্তা ১৯৯৫ সালে এএসপি হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন পেশাগত প্রশিক্ষণও নিয়েছেন।

২০২৬ সালের মার্চে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর তিনি র‍্যাবের ডিজি হিসেবে নিয়োগ পান এবং ২৮ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে সেপ্টেম্বরে তাঁকে এসআরবির প্রথম প্রধান করা হয়।

র‍্যাবের দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ছিলেন। কর্মজীবনে ডিএমপি, সিএমপি, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ, এপিবিএন, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং বিভিন্ন জেলার মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।

আলোচনায় ডিএমপি কমিশনারের নামও

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের নামও আইজিপি পদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

তবে নতুন আইজিপি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নির্ভর করতে পারে গোয়েন্দা প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অতীত কর্মকাণ্ড এবং সর্বোচ্চ পুলিশি দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার ওপর। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন সরকারপ্রধান। ফলে আলোচনায় থাকা নামগুলোর বাইরেও অন্য কোনো কর্মকর্তা বিবেচনায় আসতে পারেন।

‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে কী বলেছিলেন আইজিপি?

গত সোমবার পুরান ঢাকার চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ‘ক্রসফায়ারে’ যেতে দ্বিধা করবে না। একই অনুষ্ঠানে তিনি মন্তব্য করেন, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে তাদের ‘ফ্যাসিস্ট’ বলা হয়, আবার নিষ্ক্রিয় থাকলে ‘দুর্বল’ আখ্যা দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

তাঁর এ বক্তব্য রাজনৈতিক মহল, মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন মহলে সমালোচনার জন্ম দেয়।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী মন্তব্যটিকে সরকারের জন্য ‘বিব্রতকর’ বলে অভিহিত করেন। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, দেশে ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনা করবেন।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য ‘ঠিক হয়নি’। এ বিষয়ে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে বলেও জানান তিনি।

আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা পুলিশের

সমালোচনার মুখে ওই দিন রাতেই পুলিশ সদর দপ্তর এক ব্যাখ্যায় জানায়, আইজিপি ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারবহির্ভূত শাস্তি বোঝাতে ব্যবহার করেননি। বরং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ বোঝাতে শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর শেষে দেশে ফেরার পর আইজিপি পদে সম্ভাব্য পরিবর্তনসহ পুলিশ নেতৃত্বের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে নতুন আইজিপি নিয়োগ কিংবা বর্তমান আইজিপিকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি সম্ভাবনা ও আলোচনার পর্যায়েই থাকছে।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস) ও সংশ্লিষ্ট সূত্র।

Facebook
WhatsApp
Email
Pinterest
Telegram