
দীর্ঘ তিন মাসের অনুসন্ধানী রিপোর্ট: বিএনপি ক্ষমতায় আসার প্রথম ৩ মাসে যখন প্রথম দফায় ১৫ টাকা বাড়ানো হলো, তখন থেকেই আমাদের অনুসন্ধান শুরু। আজ ৭ মাস ১০ দিনের মাথায় দ্বিতীয় দফায় ২০ টাকা বাড়িয়ে ডিজেল ১৩৫, পেট্রোল ১৬০, অকটেন ১৬৫। সরকার বলে – বিশ্ববাজার, ভর্তুকি, লোকসান। আমরা বলছি – বিশ্ববাজার না, লোকসান ৭টা ফুটায়, আর চুরি হচ্ছে আপনার চোখের সামনে ভেসেল থেকে লরিতে।
৭টা ফুটা ও সারা বাংলাদেশে তেলের রুট? আমাদের অনুসন্ধানী টিম চট্টগ্রাম পতেঙ্গা থেকে ফেনী, কুমিল্লা, ঢাকা, বাঘাবাড়ি পর্যন্ত প্রতিটি রুট ফলো করেছে।
ফুটা ১: চট্টগ্রাম পতেঙ্গা – ইস্টার্ন রিফাইনারি ও আমদানি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল আসে চট্টগ্রাম বন্দরে। প্রতি ব্যারেলে ৫-৭ ডলার প্রিমিয়াম, ফ্রেইট, ইন্স্যুরেন্স। এই প্রিমিয়াম কে ঠিক করে? টেন্ডারে ১ ডলার বেশি মানে বছরে ১ হাজার কোটি টাকা গায়েব। আর রিফাইনারিতে হ্যান্ডলিং লস দেখানো হয় ৩.৫%, আন্তর্জাতিক নিয়ম ১.৫%। এই ২% বেশি লস মানে বছরে ১৫০০ কোটি টাকা কাগজে কলমে হাওয়া।
ফুটা ২: পতেঙ্গা থেকে ভেসেলে – ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুর রুট। পতেঙ্গা প্রধান ডিপো থেকে পদ্মা, মেঘনা, যমুনার ছোট ছোট ভেসেল – যাকে বলে লাইটার ভেসেলে করে তেল যায়।
-ফেনী ও নোয়াখালী: সোনাগাজী, মুহুরী প্রজেক্টের কাছে গোপন ডিপোতে ভেসেল খালাস হয়। এখানে ড্রাফট সার্ভে জালিয়াতি সবচেয়ে বেশি।
-চাঁদপুর ও আশুগঞ্জ: এখান থেকে কুমিল্লা, সিলেট রুটে যায়।
-ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ: ঢাকা বিভাগের জন্য।
-বাঘাবাড়ি, সিরাজগঞ্জ: উত্তরবঙ্গের জন্য।
-খুলনা, বাগেরহাট: দক্ষিণবঙ্গের জন্য।
ভেসেলে ১ লাখ লিটার লোড হলে ৯৮ হাজার লিটার আনলোড দেখানো হয়। বাকি ২ হাজার লিটার মাঝ নদীতে অন্য নৌকায় বিক্রি। এটাকে বলে সিস্টেম লস।
ফুটা ৩: ডিপোতে বাষ্পীভবন। ফতুল্লা, বাঘাবাড়ি, খুলনার খোলা ট্যাংকে গরমে তেল বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। উন্নত দেশে ফ্লোটিং রুফ ট্যাংক আছে, আমাদের এখানে নেই। বছরে ০.৫% তেল এখানেই শেষ।
ফুটা ৪: ট্যাংক লরিতে – ফেনী থেকে চট্টগ্রাম হাইওয়েতে ডাকাতি। আমাদের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে – ফেনীর মহিপাল, কুমিল্লার দাউদকান্দি, ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে রাত ২টায় ট্যাংক লরি থামিয়ে ৯ হাজার লিটারের জায়গায় ৮৮০০ লিটার পাম্পে দেয়। ২০০ লিটার রাস্তায় খোলা বাজারে ১০০ টাকায় বিক্রি। পাম্প মালিকও জড়িত।
ফুটা ৫: ব্যাংকে আটকে থাকা ৫৩ হাজার কোটি। বিপিসি ১০ বছরে ৫৩ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। সেই টাকা রাখা হয়েছে দুর্বল ব্যাংকে। সেই ব্যাংক এখন টাকা ফেরত দিতে পারছে না। নিজের লাভের টাকা তুলতে না পেরে বিপিসি এখন লোকসান দেখিয়ে দাম বাড়াচ্ছে।
ফুটা ৬: শুল্ক-করের নামে ৫৫ টাকা ডাকাতি। আপনি ১৩৫ টাকা দিলে ৫৫ টাকা চলে যায় সরকারের শুল্ক-কর, ভ্যাট, অগ্রিম কর হিসেবে। তেলের দাম বেশি না, কর বেশি।
ফুটা ৭: পাম্পে ভেজাল। ডিলার কমিশন কম বলে পাম্পে কেরোসিন মিশিয়ে ডিজেল বিক্রি। আপনি ১৩৫ টাকা দিয়ে ভেজাল কিনছেন।
১. ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯:
– ধারা ৪০: নির্ধারিত মূল্যের অধিক মূল্যে বিক্রি করলে ১ বছর জেল, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা।
– ধারা ৪৪: ওজনে ও পরিমাপে কারচুপি করলে ১ বছর জেল।
– ধারা ৪২ ও ৪৩: ভেজাল ও নকল পণ্য বিক্রি করলে ৩ বছর জেল।
ফেনী থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত যে ট্যাংক লরিতে ২০০ লিটার কম দিচ্ছে, পাম্পে কেরোসিন মেশাচ্ছে – প্রত্যেকটা ভোক্তা আইনে অপরাধ। আপনি ৯৯ নয়, ১৬১২১ নম্বরে কল করে অভিযোগ করুন।
২. তথ্য অধিকার আইন ২০০৯:
– ধারা ৪, ৫, ৮: প্রত্যেক নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার আছে। বিপিসি, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা – এরা সরকারি প্রতিষ্ঠান। আপনি তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করে জানতে পারেন – কোন ভেসেলে কত তেল গেল, ফেনী ডিপোতে কত খালাস হলো, কোন ব্যাংকে কত টাকা আছে।
তারা ২০ দিনের মধ্যে তথ্য দিতে বাধ্য। না দিলে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করলে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা।
৩. সংবিধান:
অনুচ্ছেদ ১৫(ক) ও ২১ এর (২):ধারা জনগণের জান-মাল রক্ষা ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জ্বালানি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য।
জ্বালানি মন্ত্রী, জনগণের কল্যাণী বীর চট্টলা টিভি থেকে ৫টা প্রশ্ন:
১. ফেনী, বাঘাবাড়ি, ফতুল্লা ডিপোতে ভেসেলে ২% সিস্টেম লস কেন? জিপিএস ট্র্যাকিং কোথায়?
২. বিপিসির ৫৩ হাজার কোটি টাকা কোন কোন ব্যাংকে আছে, তালিকা প্রকাশ করবেন কি?
৩. হ্যান্ডলিং লস ৩.৫% থেকে ১.৫% এ নামাতে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ফ্লোটিং রুফ লাগাবেন কবে?
৪. শুল্ক-কর ৫৫ টাকা থেকে ২০ টাকায় নামালে দাম ১০০ টাকায় আসে, শুল্ক কমাবেন নাকি শুধু দাম বাড়াবেন?
৫. ভর্তুকি জনগণের ট্যাক্সের টাকা, ভর্তুকির নামে নাটক আর কতদিন?
আমরা বলছি না আগুন লাগান। আমরা বলছি – আইন দিয়ে প্রশ্ন করুন। তথ্য অধিকার আইনে হিসাব চান, ভোক্তা অধিকারে মামলা করুন। হিসাব চাইলে সিস্টেম কাঁপে। বীর চট্টলা টিভি – আমরা দালালি করি না, আমরা হিসাব করি।১৮ কোটি জনগণের কন্ঠ