
একটা ভবন আপনার টাকায় কেনা। আপনি ১৩ তলা বানালেন। কিন্তু রাষ্ট্র বললো – না, আপনি ১০ তলা পর্যন্ত পারবেন। আপনি কোনটা মানবেন? আপনার টাকা, নাকি রাষ্ট্রের আইন? এখানেই আসে বাংলাদেশের সংবিধান।
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের অভিযান কি সংবিধান পরিপন্থী? আর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর পাঠানো ৩ দিনের লিগ্যাল নোটিশ কি সংবিধান সম্মত? আমরা কোনো পক্ষ নেবো না। আমরা কথা বলবো সংবিধান দিয়ে, সিডিএ আইন ২০১৮ দিয়ে। প্রথমে দেখি, চেয়ারম্যান কী করেছেন এবং তিনি কেন ১০০% রাইট।
১. সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮(ক):
রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ করবে। একটি অপরিকল্পিত নগরী পরিবেশ ধ্বংস করে। তাই নকশা বহির্ভূত ভবন ভাঙা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
২. সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১(২):
সকল সময়ে জনগণের সেবা করাই প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। চেয়ারম্যান সেই কর্তব্যই পালন করছেন।
৩. সিডিএ আইন ২০১৮ – ধারা ৫১ ও ৫২:
এই আইনে স্পষ্ট বলা আছে – সিডিএ-র অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করলে সিডিএ-র অথরাইজড অফিসার ও স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট (যুগ্ম জেলা জজ) ভবন ভাঙতে, সিলগালা করতে এবং জরিমানা করতে পারবেন। গতকাল খুলশী ও চান্দগাঁও-এ ম্যাজিস্ট্রেট হামিমুন তানজীন ঠিক সেই ক্ষমতাই প্রয়োগ করেছেন।
৪. সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪২:
সম্পত্তির অধিকার আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আপনি জমির মালিক, কিন্তু আইন না মেনে ১৩ তলা বানানোর অধিকার আপনার নেই। তাই সাংবিধানিকভাবে চেয়ারম্যানের বুলডোজার বৈধ। এটা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, এটা অনিয়মের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অভিযান।
এবার আসি দ্বিতীয় পক্ষে – সুপ্রিম কোর্টের বিজ্ঞ আইনজীবী মো. আমান উল্লাহ। তিনি কেন রাইট? তিনি যে ৩ দিনের নোটিশ পাঠিয়েছেন, সেটাও সংবিধান সম্মত।
১. সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ ও ৩২:
আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার। যদি কোনো নাগরিক মনে করে সিডিএ বিনা নোটিশে, সশস্ত্র পুলিশ নিয়ে স্কুল চলাকালীন অভিযান চালিয়ে শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে, তাহলে তার আইনের আশ্রয় চাওয়ার অধিকার আছে।
২. সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২:
সুপ্রিম কোর্টে রিট করার অধিকার। তিনি নোটিশে বলেছেন – ব্যবস্থা না নিলে তিনি PIL (জনস্বার্থে মামলা) করবেন। অনুচ্ছেদ ১০২ অনুযায়ী যেকোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট করতে পারেন। এটা তার সাংবিধানিক অধিকার।
৩. প্রশাসনিক আইনের মূলনীতি –
Natural Justice: কোনো প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করার আগে শুনানির সুযোগ দিতে হবে। নোটিশে অভিযোগ – ঘুষ না পেয়ে এক মাস পর বেছে বেছে জরিমানা করা হয়েছে। যদি সত্যি শুনানি ছাড়া জরিমানা হয়, তাহলে সেটা সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ পরিপন্থী। তাই আইনজীবীর নোটিশ কোনো অপরাধ নয়, এটা সংবিধান প্রদত্ত Accountability – জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া। তাহলে সমাধান কী? বীর চট্টলা টিভির পক্ষ থেকে আমরা দুই পক্ষের জন্যই একটি সাংবিধানিক প্রস্তাব দিচ্ছি, যেটা মানলে দুই পক্ষই জিতবে।
চেয়ারম্যান মহোদয়ের প্রতি প্রস্তাব:
১. অভিযানের ৭ দিন আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানো নোটিশ দিন। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ মানা হবে।
২. স্কুল চলাকালীন নয়, ছুটির পর অভিযান চালান। এতে শিশুদের ৩২ অনুচ্ছেদের অধিকার রক্ষা পাবে।
৩. অভিযানের ভিডিও করুন, যাতে কেউ ঘুষ বা হয়রানির অভিযোগ তুলতে না পারে।
বিজ্ঞ আইনজীবীর প্রতি প্রস্তাব:
১. আপনি যে ১৪টি দপ্তরে নোটিশ দিয়েছেন, সেটা আপনার অধিকার। কিন্তু সরাসরি PIL-এ যাওয়ার আগে সিডিএ সচিবের কাছে তথ্য অধিকার আইনে নথি চান – কোন ভবনের কতটুকু নকশা লঙ্ঘন হয়েছে।
২. যদি কোনো কর্মকর্তা ঘুষ চায়, তার কল রেকর্ড সহ দুদকে দিন। অনুমানের ভিত্তিতে পুরো প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত করলে পরিকল্পিত নগরীর কাজ বাধাগ্রস্ত হবে। সংবিধান বলে – রাষ্ট্র চলবে আইনের শাসনে, ভয়ে নয়।
সিডিএ চেয়ারম্যান চান নগরী বাঁচাতে আইন প্রয়োগ করতে। আইনজীবী চান – আইন প্রয়োগ যেন ন্যায়সঙ্গত হয়। দুজনের লক্ষ্যই কিন্তু এক – সুন্দর চট্টগ্রাম।তাই আমরা চাই না, এই ৩ দিনের নোটিশে সংঘাত হোক। আমরা চাই, সংবিধানের ১৮(ক) এবং ৩১ অনুচ্ছেদ – দুটোই একসাথে বাস্তবায়িত হোক।