
পিরোজপুর প্রতিনিধি:
পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন ঘিরে দিনভর উত্তেজনার পর অবশেষে পুলিশ প্রহরায় তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে প্রশাসনের সহযোগিতায় পিরোজপুর সদর উপজেলার চিথলিয়া গ্রামে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া এবং নিজ এলাকায় দাফন করা নিয়ে বাধার মুখে পড়তে হয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা তার জন্য খোঁড়া কবর মাটি দিয়ে ভরাট করে দেন বলে জানা গেছে।
পরিস্থিতির মধ্যে কবর খননের জন্য কোনো পুরুষ লোক না পাওয়ায় মানিক পশারীর বোন ও দুই মেয়ে নিজেরাই কবর খনন করেন। তবে নিজ এলাকায় তার কোনো জানাজা অনুষ্ঠিত হয়নি বলে জানা গেছে।
শনিবার দুপুরে মানিক পশারীর মরদেহ গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নেওয়া হলে স্থানীয় লোকজন বাধা দেন। পরে পুলিশি নিরাপত্তায় মরদেহ পিরোজপুর পুলিশ লাইনে নেওয়া হয়। সেখানে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। এ সময় পুলিশ লাইনের সামনে ও আশপাশে জামায়াতের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী জড়ো হন।
গার্ড অব অনার ও দাফনে বাধার অভিযোগ
মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার দেওয়া এবং তার মরদেহ নিজ এলাকায় দাফন করা নিয়ে আপত্তি জানান স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ও জামায়াত নেতারা। তাদের অভিযোগ, মানিক পশারী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। এ কারণে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া উচিত নয় বলে দাবি করেন তারা।
পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মানিক পশারী একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। তাকে কোনোভাবেই গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না এবং পিরোজপুরের মাটিতে তার মরদেহ দাফন করতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে পাড়েরহাট বন্দরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে নাসিম সাঈদীর নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়।
সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেন ও মির্জা জহুরুল হক দাবি করেন, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রাজাকার ছিলেন না এবং মানিক পশারীও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। তাদের অভিযোগ, সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করার পর মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে ও পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী মানিক পশারীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, তার বাবার বিরুদ্ধে মামলা করে মানিক পশারী মিথ্যা বক্তব্য দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মানিক পশারী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
মাসুদ সাঈদীর অভিযোগ, তৎকালীন একজন সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের মাধ্যমে মানিক পশারীর নাম মুক্তিযোদ্ধার গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
তবে গেজেটে মানিক পশারীর নাম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে থাকায় সরকার তাকে গার্ড অব অনার দিয়ে নিজ দায়িত্ব পালন করেছে বলে মন্তব্য করেন মাসুদ সাঈদী। এ বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপে তার আপত্তি নেই বলেও জানান তিনি। তবে চিথলিয়া গ্রামের বিক্ষুব্ধ লোকজন মানিক পশারীকে ওই এলাকায় দাফন করতে দিতে চান না এবং তার জন্য খোঁড়া কবর ভরাট করে দিয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন বলে জানান।
অসুস্থতায় মৃত্যু, পরিবারের অভিযোগ
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে মানিক পশারী আত্মগোপনে ছিলেন। এ সময় তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়েজামাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। গত দুই মাস ধরে অসুস্থতায় ভোগার পর শনিবার সকালে তার মৃত্যু হয়।
মানিক পশারীর মেয়েজামাই ফারুক হোসেন জানান, সকাল ১০টার দিকে তার শ্বশুরের মৃত্যু হয়। এরপর দুপুর ১২টার দিকে তারা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গেলে গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা বলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ফারুক হোসেনের দাবি, একটি সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে বরফ ছাড়াই মরদেহ নিয়ে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর গোপনে কোনোমতে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
প্রশাসনের বক্তব্য
পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফতেখারুল ইসলাম শামীম জানান, মরহুম মানিক পশারীকে পিরোজপুর পুলিশ লাইনে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। পরে শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে তার উপস্থিতিতে পুলিশ প্রহরায় মানিক পশারীকে নিজ বাড়িতে দাফন করা হয়।
দিনভর উত্তেজনা, গার্ড অব অনার নিয়ে আপত্তি এবং দাফনে বাধার অভিযোগের পর শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের সহযোগিতায় তার দাফন সম্পন্ন হয়।