
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে ব্যাপক সবুজায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন। নগরীতে ১০ লাখ গাছ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে আরও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সৌন্দর্যবর্ধন ও সবুজায়নবিষয়ক সমন্বয় সভায় এসব নির্দেশনা দেন চসিক প্রশাসক। সভায় নগরীর বিভিন্ন সড়কে বৃক্ষরোপণ, সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং সবুজায়ন উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের ঘোষণা দিয়েছেন। এটি একটি দূরদর্শী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। দেশের প্রতিটি নাগরিক বৃক্ষরোপণ ও গাছের পরিচর্যায় এগিয়ে এলে একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
তিনি বলেন, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চসিক এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সহযোগিতায় চট্টগ্রাম নগরীতে ১০ লাখ গাছ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত এক বছরে বিমানবন্দর থেকে মোহরা এবং সিটি গেট থেকে কর্ণফুলী পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ গাছ লাগানো হয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে নির্ধারিত ১০ লাখ গাছ রোপণের লক্ষ্য পূরণে সংশ্লিষ্টদের আরও আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
সড়কদ্বীপ ও উন্মুক্ত স্থানে সবুজায়ন
নগরীর কালুরঘাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কের সব মিড-আইল্যান্ড ফুল ও সবুজে সাজিয়ে তোলার কার্যক্রম চলছে বলে জানান প্রশাসক। সড়কের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি বিভিন্ন খালি জায়গা, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানে বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে।
তিনি জানান, দেওয়ানহাট থেকে বারিক বিল্ডিংয়ের মধ্যবর্তী সড়কদ্বীপে জারুল, সোনালু, রাধাচূড়া, কামিনী, কাঞ্চন, হাসনাহেনা, গন্ধরাজ ও শিউলিসহ প্রায় ১০ প্রজাতির দেশীয় গাছ লাগানো হয়েছে। বিমানবন্দর এলাকাতেও বিভিন্ন রঙের ফুল সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। এসব গাছে নিয়মিত পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার এবং পরিচর্যার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ডা. শাহাদাত বলেন, এয়ারপোর্ট রোডের সৌন্দর্যবর্ধন নগরবাসীর প্রশংসা অর্জন করেছে। মানুষ সেখানে ছবি তুলছেন এবং নান্দনিক পরিবেশ উপভোগ করছেন। এ ধরনের উদ্যোগ নগরীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও সম্প্রসারণ করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও গোলচত্বর সাজানোর পরিকল্পনা
নগরীর ফিরিঙ্গিবাজার সড়ক, কর্ণফুলী পার্কসংলগ্ন গোলচত্বর, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার এক্সেস রোড এবং চট্টগ্রাম কলেজ ও সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের সামনের সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো পরিকল্পিতভাবে সৌন্দর্যমণ্ডিত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রশাসক।
তিনি বলেন, বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করলেই একটি স্থান সুন্দর হবে, এমন নয়। সঠিক পরিকল্পনা, নান্দনিক নকশা এবং সৃজনশীল উদ্যোগের মাধ্যমে স্বল্প ব্যয়েও আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে স্থপতি ও নকশাবিদদের পরামর্শ নিয়ে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
আগ্রাবাদ এক্সেস রোডে সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি সাইকেল লেন স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের নির্দেশনাও দেন তিনি। আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নগর গড়ে তুলতে সাইকেলবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখার ওপর জোর দেন প্রশাসক।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও জনপরিসরের উন্নয়ন
প্রবর্তক মোড়, গোলপাহাড়, মেডিকেল কলেজ এলাকা, সংশ্লিষ্ট গোলচত্বর এবং জামালখানসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর সৌন্দর্য সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নির্দেশ দেন ডা. শাহাদাত হোসেন। প্রয়োজন অনুযায়ী গাছ লাগানো, গ্রিল সংস্কার এবং নান্দনিক নকশা সংযোজনের মাধ্যমে এসব এলাকার পরিবেশ আরও আকর্ষণীয় করে তোলার কথা বলেন তিনি।
নগরীর জামালখানসহ জনবহুল সড়কগুলোতে দেশের কীর্তিমান ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রশাসক। তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন স্থানে থাকা প্রতিকৃতির রং নষ্ট হয়েছে এবং কোথাও কোথাও পোস্টারে সেগুলো ঢেকে গেছে। বিদ্যমান ছবিগুলো অক্ষুণ্ন রেখে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কার করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন ছবি ও তথ্য সংযোজনের মাধ্যমে দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতি যথাযথভাবে তুলে ধরার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণে কঠোর নির্দেশনা
নগরীর সৌন্দর্য ধরে রাখতে পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসক বলেন, শুধু সৌন্দর্যবর্ধন করলেই হবে না, এসব স্থাপনা ও জনপরিসরের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে। ফুটপাত, পথচারীদের বসার বেঞ্চ এবং উন্মুক্ত স্থানগুলো পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী কার্যক্রম প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে ডিসি হিল পার্কসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বিনোদনকেন্দ্রগুলোর পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেন।
প্রশাসক আরও বলেন, সৌন্দর্যবর্ধন ও সবুজায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। ইতোমধ্যে উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ সম্পন্ন হওয়া স্থানগুলোর মান বজায় রাখার পাশাপাশি নতুন এলাকাগুলোকেও পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, নান্দনিক ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করতে হবে।
সভায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান এবং বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মঈনুল হোসেন আলী জয় উপস্থিত ছিলেন।