যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই! – ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে ১৮ বছরের মেয়ের শেষ চিঠি! সুইসাইড নাকি পরিকল্পিত হত্যা? সংবিধান কি বলে?

“আজ আমি কোনো রাজনীতির নিউজ করছি না। আজ আমি বাংলাদেশের সংবিধান হাতে নিয়ে একটা মেয়ের শেষ চিঠি পড়ছি। ‘যতটা সস্তা ভাবছো, ততটা সস্তা আমি নই’। ‘শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই… তা না হলে…’

এটা কোনো সিনেমার ডায়লগ না । এটা সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সরকারি বাসা, শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হওয়া তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের হাতে লেখা শেষ চিঠি। রোববার সন্ধ্যায় তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পাশ থেকে উদ্ধার হয় কয়েকটি চিঠি আর ডায়েরির পাতা। এখন প্রশ্ন হলো – এই মৃত্যুটা কি আত্মহত্যা, নাকি তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে?

১. বয়সের হিসাব: ছবিতে মেয়েটিকে দেখে মনে হচ্ছে তার বয়স ১৮-২০ এর ঘরে। বাংলাদেশের আইনে, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী মেয়ের বিয়ের বয়স ১৮। ১৮ বছর মানে সে শিশু নয়, সে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ বলছে – সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। তাহলে একজন এমপির স্ত্রী হলেও, সে প্রথমে একজন নাগরিক। তার জীবনের অধিকার আছে।

২. সংবিধানের হিসাব: সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ বলছে – আইনানুযায়ী ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এই মেয়েটি তার জীবন হারিয়েছে। কেন হারিয়েছে, তার উত্তর রাষ্ট্রকে দিতে হবে।

৩. তদন্তের হিসাব -যেটা গভীর তথ্য: পুলিশ যখন ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে, তখন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ এবং ১৭৬ ধারা অনুযায়ী কাজ করতে হয়। এখানে ১০০% বিচার পাওয়ার জন্য ৩টা জিনিস বাধ্যতামূলক।

ক) সুরতহাল রিপোর্ট: গলায় দাগটা কেমন ছিল? V আকৃতির না O আকৃতির? ঝুলন্ত লাশে V আকৃতির দাগ হয়, আর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ঝুলিয়ে দিলে O আকৃতির দাগ হয়।

খ) ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক: তার শরীরে ধস্তাধস্তির কোনো চিহ্ন ছিল কি না? বিষক্রিয়া ছিল কি না? ডায়েরির হাতের লেখা কি আসলেই তার? এটা পরীক্ষা করবে CID এর হস্তলিপি বিশেষজ্ঞ।

গ) শেষ চিঠির মর্ম: সে লিখেছে: ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, কিন্তু জিততে পারিনি, হেরে গেলাম মর্যাদা। জিতবই বা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে দেখি তুমিই তো ছিলে বিপক্ষ দলে’।

আরেক জায়গায় লিখেছে – ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী, কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউয়ের। আর আমি ছিলাম বোকা’। বস, এই লেখাগুলা সাধারণ লেখা না। এটা হলো দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারা – আত্মহত্যায় প্ররোচনা এবং ১০৭ ধারা – মানসিক নির্যাতনের জ্বলন্ত প্রমাণ হতে পারে। যদি প্রমাণ হয়, তাকে দিনের পর দিন মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া হয়েছে, প্রতারণা করা হয়েছে, দাবার ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তাহলে এটা আর সুইসাইড থাকে না, এটা হয়ে যায় প্ররোচনায় হত্যা। এই মেয়েটি এমপির স্ত্রী হতে পারে, কিন্তু সে কারো মেয়ে, কারো বোন। তার পরিবার বিচার চায়।

আমরা চাই –

১. এই মামলাটি যেন শেরেবাংলা নগর থানা নয়, ডিবি বা সিআইডি তদন্ত করে। কারণ ঘটনাস্থলটি হলো সরকারি ন্যাম ভবন, ক্ষমতার জায়গা।

২. তার ডায়েরি ও চিঠিগুলো যেন ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়।
৩. তার বয়স ১৮ হোক বা ২৫ হোক, সে প্রাপ্তবয়স্ক। তার অধিকার সংবিধান দিয়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক এমপি এসেছে, অনেক এমপি গেছে, কিন্তু একটা মরিয়মের চোখের পানির হিসাব যদি রাষ্ট্র দিতে না পারে, তাহলে সংবিধান ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমি কোনো এমপিকে দোষ দিচ্ছি না, আমি তদন্ত চাইছি। কারণ তদন্তই পারে বলতে – এটা সুইসাইড নাকি হত্যা। এই প্রতিবেদনটি হত্যা বা আত্মহত্যা নিশ্চিত করে না, এটি একটি সুষ্ঠু তদন্তের দাবি। সকল তথ্য পুলিশি তদন্ত সাপেক্ষ।” একটি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাক – এটাই আমাদের চাওয়া?

Facebook
WhatsApp
Email
Pinterest
Telegram