
১৭ দফা মহাপরিকল্পনায় চট্টগ্রামকে বাঁচানোর ডাক সচিব আশরাফুল আমিনের: সড়ক বাড়িয়ে নয়, ডাটা দিয়ে জ্যাম-জলাবদ্ধতা-বর্জ্য জয় – দেশের প্রথম ইন্টিগ্রেটেড কন্ট্রোল সেন্টার চট্টগ্রামে। AI ক্যামেরায় ট্রাফিক, সেন্সরে বন্যার আগাম বার্তা, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও সার, ডিজিটাল টুইনে পুরো শহরের নকশা – সচিবের পলিসিতে চট্টগ্রাম হবে সিঙ্গাপুরের চেয়েও স্মার্ট – মেয়র বললেন – এটাই ভবিষ্যৎ
বীর চট্টলা টিভির এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন সচিব আশরাফুল আমিনের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এর উদ্দেশ্যে ১৭ দফা।
আমি আশরাফুল আমিন, সচিব, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্প, বাণিজ্য ও যোগাযোগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রধান সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই মহানগর প্রতিদিন বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত।
কিন্তু জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সড়ক ও ফুটপাতের অব্যবস্থাপনা, নাগরিক নিরাপত্তা এবং পরিকল্পিত উন্নয়নের ঘাটতি চট্টগ্রামের নগরজীবনকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এসব সমস্যা সমাধানে প্রচলিত ব্যবস্থার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। আমি আমার দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ থেকে ১৭ দফা সমন্বিত মহাপরিকল্পনা তুলে ধরছি, যা বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম হবে দেশের প্রথম সত্যিকারের স্মার্ট সিটি।
পর্ব যানজট – আর সড়ক নয়, দরকার বুদ্ধিমত্তা – দফা ১-৪
দফা ১: চট্টগ্রামের যানজট শুধু মানুষের যাতায়াতের সময় বাড়ায় না, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, পণ্য পরিবহন ও পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সমস্যা মোকাবিলায় সড়কের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান সড়ক ও যানবাহন চলাচল ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন।
দফা ২: নগরের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ক্যামেরা এবং যানবাহন শনাক্তকারী সেন্সর স্থাপন করা হবে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে যানবাহনের সংখ্যা, গতি, সড়কে অপেক্ষার সময় এবং যানজটের তীব্রতা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে।
দফা ৩: এই তথ্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন মোড়ে যানবাহনের চাপ অনুযায়ী সংকেতবাতির সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করা যাবে। কোনো সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে গেলে বিকল্প পথের পরামর্শও দেওয়া যাবে।
দফা ৪: চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ – চউকের মতো সংস্থার সাথে সমন্বয় করে – যেমন আমরা আল হিদায়াহ স্কুলকে ৪৫ লাখ ও উৎসব সুপার মার্কেটকে ৫ লাখ জরিমানা করেছি – ঠিক তেমনি স্কুল, হাসপাতাল, মার্কেটের পার্কিং ব্যবস্থাপনা না থাকলে ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে জরিমানা ও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পর্ব জলাবদ্ধতা – দুর্যোগের পরে নয়, আগে – দফা ৫-৮
দফা ৫: চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান নাগরিক সমস্যা জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় নগরের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাত পরিমাপক যন্ত্র, পানির স্তর নির্ণায়ক সেন্সর এবং পানি প্রবাহ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন করা যেতে পারে।
দফা ৬: এসব যন্ত্র থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, নালা-খালের ধারণক্ষমতা, ভূমির উচ্চতা এবং পানি নিষ্কাশনের পথের তথ্য যুক্ত করলে কোন এলাকায় কখন জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে, তার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে।
দফা ৭: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অতীতের বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা যাবে। সম্ভাব্য জলাবদ্ধতার আশঙ্কা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থা, জরুরি উদ্ধারকারী দল এবং স্থানীয় প্রশাসনকে আগেই সতর্ক করা সম্ভব হবে। প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া যাবে।
দফা ৮: এক্ষেত্রে ডিজিটাল নগর প্রতিরূপ বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো নালা পরিষ্কার করা হলে, খাল পুনঃখনন করা হলে কিংবা নতুন পানি নিষ্কাশনপথ তৈরি করা হলে তার ফলে আশপাশের এলাকায় পানিপ্রবাহের কী পরিবর্তন হবে, তা আগেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। তবে প্রযুক্তি কখনোই বাস্তব অবকাঠামোর বিকল্প নয়। নালা-খাল পরিষ্কার রাখা, খাল দখলমুক্ত করা, পানি নিষ্কাশনপথ সচল রাখা এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের মতো মৌলিক কাজগুলো নিশ্চিত করতে হবে।
পর্ব বর্জ্য থেকে সম্পদ – বৃত্তাকার অর্থনীতি – দফা ৯-১২
দফা ৯: চট্টগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এ ক্ষেত্রে বৃত্তাকার অর্থনীতির ধারণা কার্যকর হতে পারে। এই ব্যবস্থায় বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান সংগ্রহ করে আবার উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়।
দফা ১০: বর্জ্যের পাত্রে সেন্সর স্থাপন করে সেগুলোর ধারণক্ষমতা ও পূর্ণ হওয়ার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অবস্থান শনাক্তকরণ প্রযুক্তির সহায়তায় বর্জ্য সংগ্রহের গাড়ির উপযুক্ত পথ ও সময় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। এতে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত, জ্বালানি ব্যয় ও পরিবহন সময় কমানো যাবে।
দফা ১১: নগরের বিভিন্ন এলাকায় বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান পৃথক করার কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। এসব কেন্দ্রে প্লাস্টিক, কাগজ, ধাতু, কাচ ও অন্যান্য উপাদান আলাদা করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে।
দফা ১২: জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার ও জৈব গ্যাস উৎপাদনের ব্যবস্থাও গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে বর্জ্যের ধরণ, আর্দ্রতা, জ্বালানিমূল্য, নির্গমন এবং পরিবেশগত নিরাপত্তা যাচাই করতে হবে। যথাযথ মানদণ্ড ও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত না করে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত নয়। নগরবাসীর অংশগ্রহণও এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য।
পর্ব মহাপরিকল্পনার হৃদপিণ্ড – সমন্বিত ডিজিটাল প্রতিরূপ – দফা ১৩-১৭
দফা ১৩: প্রশ্ন হলো, চট্টগ্রামের মতো জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নগরে এসব প্রযুক্তি কীভাবে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে? উত্তর – একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্রতিরূপ – Digital Twin। এটি হবে বাস্তব নগরের একটি হালনাগাদ ডিজিটাল সংস্করণ, যেখানে সড়ক, নালা, খাল, ভবন, ভূমির ব্যবহার, যানবাহন চলাচল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও দুর্যোগের তথ্য একই ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকবে।
দফা ১৪: এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নগরের বিভিন্ন এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রভাব আগেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। যেমন কোনো এলাকায় নতুন আবাসিক প্রকল্প গড়ে উঠলে সেখানকার সড়ক, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের উপর কী প্রভাব পড়বে। একইভাবে নতুন সড়ক নির্মাণ, সড়ক সম্প্রসারণ, উড়ালসড়ক স্থাপন কিংবা নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার আগে সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।
দফা ১৫: এ জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সড়ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংস্থা, পানি নিষ্কাশনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিচ্ছিন্ন তথ্যের পরিবর্তে একটি সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা গেলে নগরের সামগ্রিক পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
দফা ১৬: এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে টেকসই ব্যবস্থাপনা জরুরি। প্রযুক্তি কিনলেই হবে না – এর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়, তথ্যের নিরাপত্তা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, মেরামত, অর্থায়ন, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, প্রযুক্তিগত ত্রুটি মোকাবিলা – সব নীতিমালা থাকতে হবে।
দফা ১৭: স্মার্ট নগর মানে সবার জন্য সেবা। যারা প্রযুক্তি জানে না, ইন্টারনেট নেই – তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে। নাগরিক অভিযোগ গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো, সমাধানের অগ্রগতি দেখার জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল সেবা প্ল্যাটফর্ম গড়তে হবে। প্রযুক্তি শুধু সমস্যার তথ্য তুলে ধরবে না, সেই তথ্যের ভিত্তিতে সময়মতো কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
শেষ কথা: চট্টগ্রাম শুধু চট্টগ্রামের না, এটা দেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড। তাই ক্যামেরা লাগালেই স্মার্ট নগর হয় না। স্মার্ট নগর হয় – যখন তথ্যের ভিত্তিতে সময়মতো সিদ্ধান্ত হয়, জবাবদিহিতা থাকে। সেই চট্টগ্রাম গড়তে আমি আশরাফুল আমিন প্রস্তুত, মাননীয় মেয়র মহোদয়ের নেতৃত্বে।